রহস্যময় 'ভুতুড়ে কণার' কীর্তি আবিষ্কার!

সিলেটভিউ টুয়েন্টিফোর ডটকম, ২০১৭-০৮-৩০ ০০:১৪:৪২

সম্প্রতি মিলে গেল ৪৩ বছর আগের এক বিজ্ঞানীর পূর্বাভাস। এই ব্রহ্মাণ্ডের একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণা। যার নাম- নিউট্রিনো। যার আরও একটি নাম রয়েছে। ভুতুড়ে কণা। নিউট্রিনো বা ভুতুড়ে কণাদের বিচিত্র কেরামতি দেখে তো বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছেন বিজ্ঞানীরা! টগবগ করে ফুটতে শুরু করে দিয়েছেন উৎসাহে। তাঁদের আশা, মশার হাতি নাড়ানোর পথ ধরে এক দিন পৌঁছে যাওয়া যাবে বিগ ব্যাং বা সেই মহা বিস্ফোরণের ঠিক পরের সময়ে। সেই বিস্ফোরণের ঠিক পরের ৪ লক্ষ বছরে কী কী ঘটেছিল, তা তো এখনও রয়েছে পুরোপুরি অন্ধকারে।

সেই অজানা কাহিনী কেন জানতে পারিনি?
অতীত বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানতে পারি, জানতে পেরেছি এত দিন, সে সবই ওই আলোর সূত্র ধরে। আলোর কণা ‘ফোটন’-এর হাত ধরে, তারই দেখানো পথে। ফোটনই তো এই ব্রহ্মাণ্ডকে চেনা, জানার এক ও একমাত্র ‘হাতিয়ার’ হয়েছে এত দিন। হয়ে চলেছে। ব্রহ্মাণ্ডের ‘ওয়ান অ্যান্ড ওনলি টর্চ বেয়ারার’। বিগ ব্যাং-এর পরপরই জন্ম হয়েছিল আলোর কণা ফোটনের। কিন্তু সেই ফোটনগুলি তখন নিজেদের মধ্যে ঘুষোঘুষি, খুনসুটি (স্ক্যাটারিং) করতেই ব্যস্ত ছিল। বিগ ব্যাং-এর পরের ৪ লক্ষ বছর পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে সেই ঘুষোঘুষি, খুনসুটিতে মেতে থাকার ফলে ফোটনগুলি বাইরে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ছড়িয়ে, ছিটিয়ে পড়তে পারেনি। ফলে, সেই ফোটনগুলি আমাদের সামনে টর্চের আলো ফেলতে পারেনি। তাই বিগ ব্যাং-এর পরের ৪ লক্ষ বছরে ঠিক কী কী ঘটনা ঘটেছিল, তা আমরা আজও জানতে পারিনি।

আর যারা সেই অজানা ঘটনাবলী জানাতে পারতো, তারা এই ভুতুড়ে কণা বা নি‌উট্রিনো। কারণ, তারাও ফোটনের সঙ্গেই জন্মেছিল বিগ ব্যাং বা সেই মহা বিস্ফোরণের পরপরই। ফোটনরা বেরিয়ে আসতে না পারলেও, বোধহয় প্রায় ‘অশরীরী’ বলেই ভুতুড়ে কণারা কিন্তু বেরিয়ে আসতে পেরেছিল বিগ ব্যাং-এর পরেই। হু হু করে চার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে শুরু করেছিল। ছুটতে শুরু করেছিল উদ্দাম গতিতে। প্রায় আলোর কণা ফোটনের গতিবেগেই। এই ব্রহ্মাণ্ডে চলার পথে কোনও কণা, কোনও মহাজাগতিক বস্তুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি নিউট্রিনোদের।

তবে তারা যে আবার প্রায় ‘অশরীরী’! তাই ভুতুড়ে কণাদের ওপরেও এত দিন সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের গোপন রহস্যের জাল কাটার ব্যাপারে ততটা ভরসা করা যাচ্ছিল না।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এ বার ভুতুড়ে কণাদের এই বিচিত্র কেরামতি সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের গোপন রহস্যের জাল কেটে দিতে পারে এক দিন। জানা যেতে পারে সেই মহা বিস্ফোরণের পর কী কী ঘটনা ঘটেছিল। কারা কারা জন্মেছিল। জন্মানোর পর তারা কী করছিল। জানা যেতে পারে সেই মহা বিস্ফোরণের পিছনে কার হাত ছিল। কার ‘ইচ্ছা’য় ঘটেছিল ওই প্রলয়ঙ্কর বিস্ফোরণ। সেই বিস্ফোরণ ঠিক কী ভাবে বীজ পুঁতেছিল এই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টির উন্মাদনার।

তাই একটা হালকা, পলকা ভুতুড়ে কণা (খুব বেশি হলে, ইলেকট্রনের ভরের ৫ লক্ষ ভাগের মাত্র ১ ভাগ) শেষমেশ আস্ত একটা হাতিকে নাড়িয়ে দেওয়ার এই যে কেরামতি দেখাল, তা আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে হয়ে গেল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। গত সাড়ে ৪ দশক ধরে যে ঘটনা চাক্ষুষ করার জন্য হাপিত্যেশ অপেক্ষায় ছিলেন বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানীরা।

কোনও গল্পকথা নয়। নয় কোনও কল্পকাহিনীও। প্রায় অশরীরী ভুতুড়ে কণার এই কেরামতির কথা হালে প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ। গত ৩ অগস্ট সংখ্যায়। একটি আন্তর্জাতিক গবেষকদলের ওই গবেষণাপত্রটির শিরোনাম- ‘অবজারভেশন অফ কোহেরেন্ট ইল্যাস্টিক নিউট্রিনো-নিউক্লিয়াস স্ক্যাটারিং’। মূল গবেষক মস্কোর ন্যাশনাল রিসার্চ সেন্টারের ইনস্টিটিউট ফর থিয়োরেটিক্যাল অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্সের অধ্যাপক দিমিত্রি আকিমভ। গবেষকদের অন্যতম বিশিষ্ট কণাপদার্থবিজ্ঞানী জে আই কোলার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনরিকো ফের্মি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক।

ভুতুড়ে কণাদের এই বিচিত্র কেরামতি চাক্ষুষ করতে গবেষকরা বানিয়ে ফেলেছেন বিশ্বের ক্ষুদ্রতম নিউট্রিনো সন্ধানী যন্ত্র বা নিউট্রিনো ডিটেক্টর। যার ওজন সাকুল্যে সাড়ে ১৪ কিলোগ্রাম বা ৩২ পাউন্ড। যা লম্বায় ৪ ইঞ্চি। চওড়ায় ১৩ ইঞ্চি।

ভুতুড়ে কণাদের চলার পথে কেউ বাধা হতে পারে না কেন?

ভারতে নিউট্রিনো গবেষণার পথিকৃৎ বিজ্ঞানী, কলকাতার সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের (এসআইএনপি) রাজা রামান্না ডিসটিঙ্গুইজ্‌ড ফেলো অধ্যাপক নবকুমার মণ্ডলের কথায়, ‘‘সে কাউকেই পরোয়া করে না বলে। কারও সঙ্গে মেলামেশা করতে চায় না বলে। কথা বলতে চায় না বলে। মোদ্দা কথায়, এই ব্রহ্মাণ্ডে যেন কারও সঙ্গেই ইন্টারঅ্যাকশনের বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই ভুতুড়ে কণাদের। 

স্ট্রং ফোর্স বা শক্তিশালী বল তো দূরের কথা, তড়িৎ-চৌম্বকীয় বল বা ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফোর্সের সঙ্গেও কখনও কোনও বনিবনা হয় না এই ভুতুড়ে কণাদের। তাদের বনিবনা হয় শুধুই খুব দুর্বল মহাকর্ষীয় হল বা গ্র্যাভিটেশনাল ফোর্স আর অত্যন্ত অল্প পাল্লার উইক ফোর্স (যে বলে বাঁধা থাকে বলেই তেজস্ক্রিয় পদার্থের পরমাণু ভেঙে যায়) বা দুর্বল বলের সঙ্গে।

মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের (টিআইএফআর) অধ্যাপক অমল দিঘের কথায়, ‘‘কোনও কণা বা মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকশন করাটা তাদের স্বভাবে নেই বলে এই ভুতুড়ে কণারা সব কিছুর মধ্যে দিয়েই অনায়াসে গলে যায়। তাদের ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়। তাই এদের হদিশ পেতে বহু ঘাম ঝরাতে হয়েছে বিজ্ঞানীদের। ’’

ভুতুড়ে কণারা আমাদের শরীর ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কেউই টের পাচ্ছি না! কেন?

নবকুমারবাবুর বক্তব্য, এরা এতটাই ভুতুড়ে যে, প্রতি মুহূর্তে আমাদের শরীরের ১ বর্গ সেন্টিমিটারে এসে ঢুকছে ১ লক্ষ কোটি নিউট্রিনো। শরীর ফুঁড়ে সেগুলি বেরিয়েও যাচ্ছে। আমরা টেরও পাচ্ছি না। এই ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্রই প্রতি ১ ঘন সেন্টিমিটারে থাকে ৪৩০টি ফোটন। আর নিউট্রিনো কণা থাকে ৩১০টি। নিউট্রিনোরা আদতে ইলেকট্রনের মতোই মৌল কণা। তাদের আর ভাঙা যায় না। তবে ইলেকট্রনের যেমন আধান (চার্জ) রয়েছে, এদের তা নেই। নিউট্রিনোরা একেবারে শ্রীনিরপেক্ষ! ’৬০-এর দশকের শেষাশেষি প্রথম জানা যায়, এরা তিন ধরনের হয়। মানে, তাদের তিন ধরনের ‘ফ্লেভার’ থাকে। ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউওন নিউট্রিনো আর টাওন নিউট্রিনো। এও জানা গিয়েছে, ব্রহ্মাণ্ডে নিজেদের যাত্রাপথে এরা ‘বহুরূপী’ হয়। এক রূপ থেকে ঘন ঘন বদলে যায় অন্য রূপে। ইলেকট্রন নিউট্রিনো বদলে যায় মিউওন নিউট্রিনো বা টাওন নিউট্রিনোয়। আর ’৯৮ সালে প্রথম জানা যায়, এদের ভরও রয়েছে খুব সামান্যই। তবে তা কত, এখনও ঠিকঠাক ভাবে তা জানা সম্ভব হয়নি। সুজয় চক্রবর্তী, আনন্দবাজার পত্রিকা।

সংবাদটি পড়া হয়েছে মোট : ১২৭ বার

শেয়ার করুন

আপনার মতামত দিন

সর্বশেষ খবর

  •   চুনারুঘাটে ফয়সল ডাকাত গ্রেফতার
  •   কাদেরকে জড়িয়ে ধরে সেলিম ওসমানের কান্না
  •   মির্জা ফখরুলের সিম ক্লোন করে প্রতারণা
  •   সংসদে মওদুদের কড়া সমালোচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী
  •   জকিগঞ্জে শীঘ্রই শুরু হচ্ছে কাউন্সিলর আজাদ কাপ ফুটবল
  •   মহানগর যুব জমিয়তের অভিষেক সম্পন্ন
  •   কুলাউড়ায় প্রাথমিক পরীক্ষায় অনিয়মের দায়ে সেই শিক্ষক বরখাস্ত
  •   বানিয়াচংয়ে মাদ্রাসাছাত্রীকে মারধর, বখাটের কারাদণ্ড
  •   সৌদির রিয়াদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক সিলেটীর মৃত্যু
  •   বিয়ানীবাজারে আদালত সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক র‌্যালি
  •   বড়লেখায় ডাকাতের হামলায় আহত ৩, নারীসহ ৩ ডাকাত গ্রেফতার
  •   ছাত্রলীগ যুক্তরাষ্ট্র শাখার সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ স্থগিত
  •   বিয়ানীবাজারে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মীসভা অনুষ্ঠিত
  •   মৌলভীবাজারে সরকারের উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে আলোচনা সভা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী
  •   জৈন্তাপুরে অজগর সাপ অাটক, ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক সাপ উদ্ধার
  • সাম্প্রতিক তথ্য-প্রযুক্তি খবর

  •   যে শব্দগুলো গুগলে ভুলেও খুঁজবেন না
  •   ফেসবুকের কয়েকটি চমৎকার অপশন
  •   চালক ছাড়াই চলবে গাড়ি
  •   ২০১৮ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের মুখোমুখি হতে চলেছে পৃথিবী!
  •   নাসার গবেষণা অনুযায়ী ১০০ বছরে তলিয়ে যাবে যে শহরগুলি!
  •   ইউটিউবকে টেক্কা দিতে ক্রিয়েটর অ্যাপ
  •   মাত্র ১০ সেকেন্ডে স্মার্টফোনে ধরা পড়বে এইচআইভি!
  •   ফেসবুক ব্যবহারে সাবধানতা, আইডি হ্যাক হলে করণীয়
  •   ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকার কিছু মৌলিক টিপস
  •   আইফোন এক্স : অনন্য সাধারণ যন্ত্র, তবে সাবধান!
  •   এবার টাকা পাঠানো যাবে ফেসবুকে!
  •   অনলাইন শপিং করছেন? সাবধান!
  •   উড়ন্ত ট্যক্সি আনছে উবার! খরচও হাতের নাগালে!
  •   'খুব দ্রুতই আগুনের গোলা হবে পৃথিবী'!
  •   হোয়াটস অ্যাপের পর এবার বন্ধ ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার!